Sunday, October 3, 2021

চা পান করলে ত্বক কালো হয়না

 গুজবে কান দিবেন না , চা পান করলে ত্বক কালো হয়না।

চা খেলে যদি বাস্তবিকই কেউ কালো হয়ে যেত, তাহলে তো ইংরেজ ও আইরিশদের গায়ের রং আগেই পাল্টে যেত। কিন্তু এমনটা তো হয়নি। দিনে ১০-১৫ কাপ খেলেও না। তাহলে? আসলে কে কালো হবে, কে ফর্সা তা অনেকাংশেই নির্ভর করে ত্বকের অন্দরে থাকা মেলানিন নামে একটি উপাদানের ওপর। আর এমন কোনো গবেষণা আজ পর্যন্ত হয়নি প্রমাণ হয়নি যে চা খেলে মেলানিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই চা খেলে কালো হয়ে যাব—এ ধারণাটাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রসঙ্গত, জিনগত কারণ এবং রোদে কতটা সময় কাটানো হচ্ছে, এ দুটি বিষয়ের ওপর গায়ের রং অনেকাংশেই নির্ভর করে থাকে। প্রসঙ্গত, আমাদের শরীরকে ভালো রাখতে লিকার চা এবং গ্রিন টি বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

চা পান করলে ত্বক কালো হয়না


চা নিয়ে ছড়ানো সব থেকে বড় গুজব

 আসামে চা রোপণকারীদের দাবির প্রেক্ষিতে ১৮৯১ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে বাংলার পূর্ব দিকে রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু করে। কুমিল্লা থেকে শুরু সিলেট হয়ে ওই রেলপথ এগিয়েছিল তিনসুকিয়া, গৌহাটির দিকে। বিহার আর অসম থেকে চা বাগানের শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। একটা সময়ের পর মালিকপক্ষের অত্যাচার সহ্যের সীমা ছাড়ায়।

চা গুজব


ফলে একজোটে প্রতিবাদে সামিল হয় কয়েকশো চা বাগানের শ্রমিক। শ্রমিকদের লাগাতার আন্দোলনে মাথায় হাত পড়ে চা বাগানের মালিকদের। ১৯২১ সালে, গোয়ালন্দ স্টিমার ঘাটে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর গুলিও চালানো হয়। এর ফলে এই আন্দোলনের আগুনে যেন ঘি পড়ল! চায়ের ব্যবসা যখন প্রায় লাটে উঠতে চলেছে, তখন এই বঙ্গ অঞ্চলের প্রতিটি স্ট্রেশনে বিজ্ঞাপনটি দেওয়ার কথা মাথায় আসে চা বাগানের মালিকদের। ছবিটি ভারতের দমদম স্টেশনের ১০০ বছর আগের দেওয়া সেই বিজ্ঞাপনের, বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার পোড়াদহ স্টেশনে আগে ছিল শুনেছিলাম। এখন আছে কি না জানিনা।

চা খেলে প্লেগ, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়ার মতো অসুখ যে সারে না, তা আধুনিক বাঙালির ভাল করেই জানে। কিন্তু আড্ডায় চায়ের কাপে চুমুক না দিলে কি চলে!

ইংল্যান্ডে প্রথম চা প্রচলনের গল্প

 ১৬৬২ সালের ১৪ মে ঝকঝকে রৌদ্রের পড়ন্ত এক বিকালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন একজন রমণীর জন্য- যিনি শীঘ্রই হতে যাচ্ছেন ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ রানী বা কুইন। তিনি বিশেষ দূত মারফত আগেভাগেই খবর পেয়েছেন, আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজদরবারে পদার্পণ করবেন পূর্তগালের রাজকুমারী ক্যাথেরিন ব্রাগেঞ্জা। রাজা চার্লস ক্যাথেরিনকে দেখতে এতটাই ব্যাকুল হয়ে আছেন যে, তিনি যেন নিজেকে আর কিছুতেই ধরে রাখতে পারছেন না। যদিও লোকমুখে তিনি জানতে পেরেছেন যে, ক্যাথেরিন দেখতে অতীব সুন্দরী ও একজন বিদূষী নারী। তার পরও তিনি মুখিয়ে আছেন রাজকুমারীর মুখ দর্শনের জন্য। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রাজকুমারীর শুভাগমনে রাজদরবার প্রাঙ্গণ বাদ্য-বাজনার ঐশ্বরিক সুর মূর্ছনার ঝঙ্কারে চারপাশ আমদিত হয়ে উঠল। রাজা বিলক্ষণ বুঝলেন এই সুর মূর্ছনার যথার্থ কারণ। রাজদরবারের অন্যান্য সভাসদ ও রাজ আমর্ত্যরাও সচেতন ও সটান দাঁড়িয়ে অপেক্ষমাণ রইলেন আগত রাজকুমারীর জন্য। ক্যাথেরিন রাজদরবারে প্রবেশ করেই মাথাটি ঈষৎ ন্যুব্জ করে রাজা দ্বিতীয় চার্লসকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন ও অভিবাদন জানালেন। রাজা চার্লসও দাঁড়িয়ে রাজকুমারীর উদ্দেশে তার শুভেচ্ছা ও আন্তরিকতা প্রকাশ করলেন। চার্লস এবার রানীকে জিজ্ঞেস করলেন যাত্রাপথের ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করতে তিনি কী ধরনের পানীয় পান করতে ইচ্ছুক? রানী কিছুটা লাজুক কিন্তু সপ্রতিভ ভঙ্গিতে রাজাকে বললেন, আমার আপাতত এক গেলাস (কারণ তখনো পর্যন্ত পেয়ালায় চা পানের সংস্কৃতি চালু হয়নি) চা হলেই চলবে।



শুধু রাজা চার্লসই নয়, রাজদরবারে সব উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ও অতিথিরা অবাক হলেন। কারণ চা পানীয়টি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত তারা যৎসামান্যই অবগত। বিশেষ করে রাজা চার্লস মনেও করতে পারলেন না চা বস্তুটি তিনি জীবনে আদৌ দেখেছেন কিনা? ইতিমধ্যে একজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী রাজার কানে ফিসফিস করে কী যেন বললেন। রাজা এবার রাজকুমারী ক্যাথেরিনকে বললেন- আমরা দুঃখিত সম্রাজ্ঞী। আমাদের এখানে চা পানীয়টির একেবারেই প্রচলন নেই। আপনি আপনার ক্লান্তি দূর করতে এক গ্লাস উৎকৃষ্ট বিয়ার পান করতে পারেন। এই হলো ইংল্যান্ডে প্রথম চা প্রচলন কাহিনী।

রাশিন ক্যারাভান চা এর উৎপত্তি

 

রাশিন ক্যারাভান চা

১৬০০ সালের দিকে রুশদের কাছে বেশিরভাগ চা পৌঁছাতো চীন থেকে রাশিয়ার পথে ক্যারাভান রুটে। উটের কাফেলা মাসের পর মাস ধরে ভ্রমণ করে মহাদেশ জুড়ে চা বহন করে চলত। যাত্রা শেষ করতে একটি কাফেলার ১৬ মাস সময় লাগতো এবং প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে হতো। তাদের রাতের ক্যাম্প-ফায়ারের ধোঁয়া চায়ের ওপর পড়তো এবং যতক্ষণে তারা মস্কো কিংবা সেন্ট পিটার্সবার্গ পৌঁছাতো, পাতাগুলোতে ধোঁয়াটে স্বাদ তৈরি হতো আর সেখান থেকে তৈরি হওয়া সেই চায়ের স্বাদ যা আজকের দিনে রাশিন ক্যারাভান চা হিসেবে পরিচিত।

লাহোর রেলস্টেশনের টি স্টলের

 ভারতবর্ষে চায়ের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে ইন্ডিয়ান টি চেজ কমিটির উদ্যেগে ১৯৩০ সালে ৫০ টিরও বেশি স্টেশনে টি স্টল স্থাপন করা হয়। তবে হিন্দু-মুসলমান জাত ও ধর্মের বিভেদের কারণে একই সাথে বসে একই কাপে চা খেতে বেশিরভাগ মানুষই নারাজ ছিল। তখন কিছু স্টেশন স্টেশনে হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য আলাদা টি স্টল তৈরি করা হয় এবং কিছু স্টেশন একই টি স্টলের দুই পাশে হিন্দু ও মুসলমানদের আলাদা চা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।।

টি স্টলের


ছবিটি লাহোর রেলস্টেশনে অবস্থিত টি স্টলের। বাঁ পাশে হিন্দুদের এবং ডান পাশে মুসলমানদের চা পানের ব্যবস্থা। ছবিটি ডব্লিউ এইচ উকার্সের লেখা চা–বিষয়ক আকর গ্রন্থ ‘অল অ্যাবাউট টি’ শীর্ষক বইতে প্রকাশিত।

হারিয়ে যাওয়া সেই টি-টোকেন

 ১৮৭০ সালের দিকে ভারতবর্ষের অনেক চা-বাগানে টি-টোকেনের ব্যবহার শুরু করে। চা শ্রমিদের মজুরি হিসেবে এই ধাতব টোকেন দেওয়া হতো।

টি-টোকেন


আসাম-বেঙ্গল রেলপথ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত কলকাতা থেকে এসব চা-বাগানে ধাতব মুদ্রা পরিবহন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল ছিল। শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার জন্য প্রচুর পরিমাণে পাই, পয়সা ও আনার মতো ক্ষুদ্র মূল্যমানের মুদ্রার প্রয়োজন হতো। টাঁকশাল থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্ষুদ্র মূল্যমানের মুদ্রার সরবরাহ না থাকায়, মুদ্রা সংগ্রহের জন্য বাগান কর্তৃপক্ষকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হতো এবং বড় অঙ্কের বাট্টা (কমিশন) গুনতে হতো। এই সংকট নিরসনে বড় বড় চা বাগানে তখন টি-টোকেনের ব্যবহার শুরু করে। টোকেন-পদ্ধতি চালুর পেছনে আরেকটি অন্তর্নিহিত কারণ ছিল।
কঠোর পরিশ্রম, বৈরী পরিবেশ আর অতি নিম্ন মজুরির কারণে শ্রমিকেরা প্রায়ই বাগান থেকে পালিয়ে যেতে চাইতেন। অনেকে সময় স্বজনদের দেখতে মন চাইলেও যাওয়ার উপায় ছিল না। কারণ টোকেনের বিপরীতে বাগানের ভেতরের নির্ধারিত দোকান থেকেই শুধু পণ্য কেনা যেত, বাগানের বাইরে থেকে এই এই টোকেনে কিছুই কিনা যেত না। বিনিময়মূল্য হিসেবে সরকার প্রচলিত মুদ্রা প্রাপ্তির কোনো সুযোগ ছিল না। আর বাগানের বাইরে এসব টোকেনের কোনো মূল্য ছিল না। ফলে শ্রমিকেরা চাইলেও বাগান ত্যাগ করতে পারতেন না।
প্রথম ছবি: ব্রিটিশ কোম্পানি ডানকান ব্রাদার্সের আওতাধীন লংলা চা-বাগানে ব্যবহৃত টোকেন। এটিতে মূল্যমান উল্লেখ নেই। তবে মুদ্রাসংক্রান্ত নিলামের অনলাইন পোর্টাল ‘নিউমিসবিডস’ থেকে ছবিটি সংগ্রহ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ছবি: ভারতের কেরালা রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কানান দেভান হিল প্ল্যান্টেশনস কোম্পানি (কেডিএইচপি) কর্তৃক ব্যবহৃত দুই আনা মূল্যের টি-টোকেন। এটি ব্রোঞ্জের। প্রস্তুতকাল ১৮৯৯, ওজন ৬ দশমিক ৯১ গ্রাম, পুরুত্ব ২৭ মিমি। মুদ্রার মুখ্য দিকের মাঝ বরাবর শ্মশ্রুমণ্ডিত ব্যক্তির মুখ। আর গৌণ দিকে ফ্যাক্টরি বিল্ডিংয়ের ছবিসহ কেডিএইচপির নাম খোদাই করা। মুদ্রাসংক্রান্ত নিলামের অনলাইন পোর্টাল ‘নিউমিসবিডস’ হতে ছবিটি সংগ্রহ করা হয়েছে।
(সকল তথ্য প্রথম আলোতে প্রকাশিত গবেষক হোসাইন মোহাম্মদ জাকির "হারিয়ে যাওয়া সেই টি-টোকেন" শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে নেওয়া।)

এ গার্ডেনার, এ থিফ, এ স্পাই

সপ্তদশ শতকে চীন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরলে ব্রিটিশদের চায়ের জন্য অন্য দেশের দিকে মনোযোগ দিতে হয়।

ব্রিটিশ টি রবারি


ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যেটি বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতো তারা একজন স্কটিশ উদ্ভিদ বিজ্ঞানী রবার্ট ফরচুনকে নিয়োগ করলো। যিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিদেশি বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ এবং সেগুলো অভিজাতদের কাছে বিক্রির জন্য পরিচিত ছিলেন।
রবার্ট ফরচুন নামে একজন স্কটিশ উদ্ভিদ বিজ্ঞানীকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। চীনা পোশাক পরিয়ে তাঁকে বিদেশিদের জন্য নিষিদ্ধ চীনের এমন চা–অঞ্চলে পাঠানো হয়। ফরচুন গভীরভাবে সেখানে চা উৎপাদন পর্যবেক্ষণ করেন এবং যথেষ্ট পরিমাণ চায়ের বীজ নিয়ে ফেরত আসেন।
ফরচুন চীন থেকে শুধু বীজ এবং চারাই আনেননি, সঙ্গে করে একদল প্রশিক্ষিত চীনা চা–শ্রমিককেও ভাগিয়ে আনেন। নতুন পানি ও আবহাওয়ায় যৎসামান্য কিছু চারা বাঁচে। চীন থেকে আনা প্রযুক্তি ও জ্ঞান ভারতবর্ষে চা–শিল্পের সূচনা ত্বরান্বিত করে।
ইতিহাসে এই ঘটনাটি "ব্রিটিশ টি রবারি" নামে খ্যাত। করপোরেট গুপ্তচরবৃত্তির এই ঘটনা নিয়ে সাংবাদিক সারাহ রোজের লেখা ‘ফর অল দ্য টি ইন চায়না: হাও ইংল্যান্ড স্টোল দ্য ওয়ার্ল্ডস ফেবারিট ড্রিংক অ্যান্ড চেঞ্জড হিস্ট্রি’ (২০১০) একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। ফরচুনের কর্মকাণ্ডে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বইটির শুরুতে রোজ লিখেছেন ‘দ্য টাস্ক রিকয়ার্ড এ প্ল্যান্ট হান্টার, এ গার্ডেনার, এ থিফ, এ স্পাই’।

চা পান করলে ত্বক কালো হয়না

  গুজবে কান দিবেন না , চা পান করলে ত্বক কালো হয়না। চা খেলে যদি বাস্তবিকই কেউ কালো হয়ে যেত, তাহলে তো ইংরেজ ও আইরিশদের গায়ের রং আগেই পাল্টে ...